প্রেস রিলিজ

৩০ উপজেলায় ১২ লাখ শিশুকে সুরক্ষা দিতে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির সঙ্গে যৌথভাবে হাম-রুবেলার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে বাংলাদেশ

০৬ এপ্রিল ২০২৬

৫ এপ্রিল, ৩০ উপজেলায় শুরু হওয়া এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ১২ এপ্রিল থেকে চারটি সিটি করপোরেশনেও চলবে এবং ৩ মে থেকে দেশজুড়ে শুরু হবে।

ঢাকা, ৫ এপ্রিল, ২০২৬- ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ও গ্যাভি, দ্যা ভ্যাকসিন অ্যালায়ন্সের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। প্রথমে, সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত ১২ লাখের বেশি শিশুকে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে এই কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে।পরবর্তীতে, ধাপে ধাপে এই টিকাদান কর্মসূচি সারা দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও বাকি জেলা গুলোতে সম্প্রসারণ করা হবে।

মাননীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “বর্তমানে দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এত বড় কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা প্রদান এবং দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ইউনিসেফের রিপ্রেজেন্টেটিভ মিস রানা ফ্লাওয়ার্সকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে, স্বাস্থ্যও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গ্যাভি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই”।

জরুরি এই টিকাদান কর্মসূচিতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা না পাওয়া এবং গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতা হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা ও কক্সবাজারে ঘনবসতিপূর্ণ ও উচ্চ ঝুঁকির এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনতে কঠোর প্রচেষ্টা চালানো হবে।

দ্রুত টিকাদান এবং রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জোরালো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সংক্রমণ বাড়তে থাকবে, তাতে স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে এবং শিশুস্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতির ঝুঁকি তৈরি করবে। এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত টিকাদান প্রচেষ্টার সম্পূরক হিসেবে কাজ করবে এবং এটি হলো টিকাদানের লক্ষ্যপূরণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী এবং ভবিষ্যতে সংক্রমণ প্রতিরোধের সক্ষমতা তৈরির একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ বিশেষ।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “শিশুদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে টিকা একটি মৌলিক উপাদান।বাংলাদেশ জুড়ে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে হাজার হাজার শিশু, বিশেষ করে ছোট শিশুও সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকা শিশুরা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ায় ইউনিসেফ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এভাবে সংক্রমণ ফিরে আসাটা গুরুতর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির (ইমিউনিটি গ্যাপ) দিকটি তুলে ধরছে, বিশেষকরে যেসব শিশুরা একেবারেই কোনো টিকা পায়নি (জিরো-ডোজ) অথবা টিকার আংশিক ডোজ পেয়েছে এমন শিশুদের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি নয় মাসের কমবয়সী শিশু যারা এখনো নিয়মিত টিকাদানের জন্য উপযুক্ত নয়, তাদেরও সংক্রমিত হওয়ার বিশয়টা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।”

রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, “যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছে, তাদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং বাংলাদেশ সরকার এই জরুরি টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে তাতে সহায়তা প্রদান করছি। সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সংক্রমণের এই ফিরে আসাটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রতিটি শিশু যেন টিকার আওতায় আসে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করা যায়এবং এই প্রতিরোধযোগ্য রোগথেকে বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে ইউনিসেফ সরকার ও অংশীজনদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।”

দাতাদের বিশেষ করে গ্যাভিকে ধন্যবাদ।ইউনিসেফ টিকা কেনা ও বিতরণ, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, জনসচেতনতা তৈরি এবং বাবা-মা ও অভিভাবকেরা (কেয়ারগিভার) যাতে অবগত থাকেন ও তাদের সন্তানদের টিকা দেন সেটা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ইউনিসেফ। এছাড়া প্রত্যন্ত এলাকার শিশু, উপেক্ষিত থেকে যাওয়া শিশু ও সমস্যা সঙ্কুল এলাকার শিশুদের টিকাদান নিশ্চিতে সম্মুখভাগের স্বাস্থ্যকর্মী ও অংশীজনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে ইউনিসেফ।

বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচ) প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশিদ মোহামেদ বলেন, “সুনির্দিষ্ট ও সময়োচিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।” তিনি বলেন, “দেশজুড়ে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর উচ্চ ঝুঁকির এলাকাগুলোর ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে গৃহীত এই টিকাদান কর্মসূচি আরও শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঠেকানো এবং এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পেছনে যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার (ইমিউনিটি গ্যাপ) ঘাটতি রয়েছে তা দূর করতে সহায়তা করবে। হাম-রুবেলার টিকা নিরাপদ ও কার্যকর এবং তা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশুকে সুরক্ষিত করেছে- দ্রুত সংক্রমিত হওয়া এই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটাই আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।”

ডা. আহমেদ জামশিদ মোহামেদ আরও বলেন, “বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সব বাবা-মাও অভিভাবকদের (কেয়ারগিভার) প্রতি তাদের সন্তানদের নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে টিকা দেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে এবং বাংলাদেশজুড়ে প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ও অংশীজনদের সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।”

বাংলাদেশে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সিনিয়র কান্ট্রি ম্যানেজার ডির্ক গেহল বলেন, “এইপ্রাদুর্ভাবে শিশুদের প্রাণহানি একটি মর্মান্তিক বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, রোগ প্রতিরোধে ঘাটতি থাকলে হাম দ্রুতই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। স্বাস্থ্যও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথভাবে গ্যাভি ইতিমধ্যে দেশে থাকা হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের সর্বোচ্চ কার্যকর উপায়ে একসঙ্গে কাজ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।”

বাংলাদেশে উচ্চ হারে শিশুদের টিকাদানের একটি সফল ইতিহাস রয়েছে।কিন্তু সামান্য বিঘ্নও, সময়ের সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি (ইমিউনিটিগ্যাপ) দেখা দেওয়ার কারণ হতে পারে। বর্তমানে যেভাবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তা সাধারণত কোনো একক কারণে নয়, বরং এ ধরনের ঘাটতিগুলোর সামগ্রিক ফলাফল। টিকা সংগ্রহের প্রধানসংস্থা হিসেবে ইউনিসেফ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, যাতে সময়মতো মানসম্মত টিকা পাওয়াটা নিশ্চিত করা যায় এবং চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সরবরাহ দ্রুততর করা যায়।

উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত রোগীর চাপ, রোগীদের আলাদা রাখার (আইসোলেশন) সক্ষমতার ঘাটতি এবং রেফারেল ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কক্সবাজারের মতন উচ্চ জনঘনত্ব এলাকায় মানুষের সার্বক্ষনিক চলাচলের কারণে এই চ্যালেঞ্জগুলো আরও তীব্র হয়েছে, ফলে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০০৭ সাল থেকে গ্যাভি ৫৭ টি নিম্ন আয়ের দেশে নিয়মিত টিকাদানকর্মসূচি, প্রতিরোধমূলক ক্যাম্পেইন এবং প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা কর্মসূচির মাধ্যমে হাম ও হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমে সহায়তা দিতে ২ দশমিক২ বিলিয়ন (২২০ কোটি) মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে (যার মধ্যে গত পাঁচ বছরেই ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার- ১১০ কোটি ডলার রয়েছে)। এর মাধ্যমে ১ দশমিক ৩ বিলিয়নেরও (১৩০কোটি) বেশি শিশুকে টিকাদানসম্ভব হয়েছে।

২০২৪ সালে গ্যাভি হাম প্রতিরোধে অন্যতম বৃহত্তম উদ্যোগকে সমর্থন দেয়, যেখানে ২৪ টি দেশে ক্যাচ-আপ (নিয়মিত টিকানা পাওয়া শিশুদের টিকাদান) ও ফলো-আপ ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৬ কোটি ২০ লাখেরও (৬২ মিলিয়ন) বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। পাশাপাশি পাঁচটি দেশে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সহায়তা দিয়ে প্রায় ৬৮ লাখ (৬দশমিক ৮ মিলিয়ন) শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।

গ্যাভি লিপ রিফর্ম (সংস্কার) এজেন্ডার আওতায়, দ্যা আল্যায়েন্স ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন প্রদান এবং বৃহৎ পরিসরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি দূর করতে বিভিন্ন দেশের সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রচেষ্টাগুলোকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দেবে।

বাংলাদেশে সকল শিশু আজ ও ভবিষ্যতে যেন সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করতে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে টিকাদান ও শিশুস্বাস্থ্য সেবায় ধারাবাহিক ও টেকসই বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে।

এই উদ্যোগে জাতিসংঘের যে সকল সংস্থা যুক্ত

ইউনিসেফ
জাতিসংঘ শিশু-বিষয়ক সংস্থা
ডব্লিউএইচও
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা যে টেকসই লক্ষ্যগুলোকে সমর্থন দিচ্ছি