লন্ডন জলবায়ু অ্যাকশন সপ্তাহ উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তৃতা
London, 23 June 2026
প্রিয় বন্ধুগণ,
সংকট থেকে স্বচ্ছতা আসে।
আজ এখানে, এই লন্ডন শহরে, চালর্স ডিকেন্সের শহর লন্ডনে এটা পরিষ্কার যে আমাদের আজকের পৃথিবী ‘দুই সংকটের গল্পের’ মুখোমুখি।
এক দিকে জলবায়ু সংকট আমাদের ক্রমাগত আরও উচ্চ তাপমাত্রার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে, বিপর্যকর মাত্রার আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।
অন্য দিকে জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে হাইড্রোকার্বনের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল পৃথিবীর অদূরদর্শিতা।
সাদা চোখে এই দুটো সংকটকে আলাদা মনে হতে পারে।
কিন্তু দুই সংকটের পেছনেই রয়েছে একই ধ্বংসাত্মক শক্তি:
সেটা হলো জীবাশ্ম জ্বালানি।
এবং দুই সংকটই দাবি করে অভিন্ন সমাধান:
তা হলো, দ্রুত গতিতে যথাযথভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সাধন এবং অভিযোজনক্ষমতা, টিকে থাকা ও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইতিমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির শিকার মানুষদের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার ত্বরান্বিত করা।
প্রিয় বন্ধুগণ,
আমাদের এক নম্বর সমস্যা হলো, আমাদের চোখের সামনেই জলবায়ু নৈরাজ্য ত্বরান্বিত হচ্ছে।
এ যাবৎ কালে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে উত্তপ্ত এগারো বছর আমরা অতিক্রম করছি।
জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে নানা রকমের দুর্যোগ ক্রমশই আরও ঘন ঘন ঘটছে; সেগুলো আরও ধ্বংসত্মক হয়ে উঠছে; আরও বেশি বেশি ক্ষয়ক্ষতির কারণ ঘটাচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলছে যে আমরা এখনো বিপর্যয়ের কিছুই দেখিনি।
এল নিনো আমাদের দরজায় শুধুই কড়া নাড়ছে না; বাড়িটাই উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হুমকি দিচ্ছে। তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলছে। খাদ্য ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা–বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে পীড়িত ও নাজুক জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর।
আজ থেকে দশ বছর আগে প্যারিসে বিশ্বনেতারা একমত হয়েছিলেন যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী কয়েক বছরে গড় বার্ষিক তাপমাত্রা সেই সীমা অতিক্রম করে যাবে।
সামনে আমাদের করণীয় হলো এই অতিরিক্ত বৃদ্ধি কঠোরভাবে সীমিত করা, এর স্থায়িত্ব কমানো, এবং যত দ্রুত সম্ভব তাপমাত্রা আবার ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনা।
প্রতিটি ভগ্নাংশ ডিগ্রিই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান।
কারণ, এই অতিরিক্ত বৃদ্ধি যত বেশি হবে, যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তত বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে এই গ্রহের সেই সীমারেখা অতিক্রম করার, যার ফলে এমন মাত্রার সব পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে যা আর শোধরানো যাবে না।
জাতিসংঘের বৈজ্ঞানিক পরামর্শক বোর্ড একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছে, সেই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এর অর্থ কী হতে পারে।
প্রবাল দ্বীপগুলোকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।
গ্রিনল্যান্ড ও পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর গলে যাওয়ার গতি আরও ত্বরান্বিত হবে; তার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যাবে; সমুদ্র উপকূলগুলো আকার–আকৃতি বদলে যাবে; লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে এবং কিছু দ্বীপরাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে।
আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান মহাসাগরীয় সঞ্চালন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
এবং আমাজন রেইনফরেস্টের কিছু অংশ বনজঙ্গল ধ্বংস হয়ে অনুর্বর তৃণভূমি বা সাভান্নার মতো অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার দিকে এগোবে।
প্রিয় বন্ধুগণ,
পৃথিবী নামের এই গ্রহটির পক্ষে সহনীয় তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমা আসলে গাড়ির আয়না দিয়ে দেখা জিনিসগুলোর মতো।
গাড়ির আয়নায় বিভিন্ন জিনিসপত্র যত দূরে দেখা যায়, আসলে সেগুলো তত দূরের নয়; বরং বেশ কাছেরই।
একই সময়ে আমরা আরও একটি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি:
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ–সংঘাত থেকে সৃষ্টি হয়েছে সমস্ত জ্বালানি ধাক্কা।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, এই জ্বালানি সংকটের মাত্রা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট...এবং সঙ্গে তুলনীয়… এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর যে জ্বালানি ক্ষেত্রে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল––এই দুই সংকটের যোগফলের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার মতো।
অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা শুধু জ্বালানি সংকট নয়;
এ থেকে সৃষ্টি হয়েছে তাদের ঋণের সংকট। খাদ্যের সংকট। উন্নয়নের সংকট।
এই সঙ্গে আমি আরও বলব যে, আমরা যে কোনো শান্তিচুক্তিকে অবশ্যই স্বাগত জানাই, যার ফলে খুব প্রয়োজনীয় স্বস্তি আসবে; কিন্তু ভুল করবেন না—এই সংকটের প্রভাব সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী হবে।
প্রিয় বন্ধুগণ,
এই দুই সংকটের মধ্য দিয়ে একটি সেকেলে উন্নয়ন মডেলের সীমাবদ্ধতা পরিষ্কার হয়েছে।
এটা এমন এক উন্নয়ন মডেল যার প্রধান চালিকাশক্তি জীবাশ্ম জ্বালানি; অথচ একটা যুদ্ধই গোটা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিরাট ওলোটপালট ঘটাতে পারে; একটা বাধাবিঘ্নই জ্বালানির মূল্য আকাশে তুলতে পারে।
এটা এমন এক মডেল, যেখানে মনে করা হয় প্রকৃতি অফুরন্ত, পরিণাম কী হতে পারে তা না ভেবেই প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছ ভোগ করা যায়।
এটা এমন একটা মডেল, যা বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করেছে, কিন্তু যার ফলে মানুষে মানুষে বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে, যা উসকে দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা।
এটা এমন একটা মডেল, যেখানে যারা এই সংকটগুলোর জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তাদেরই সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।
এই মডেল থেকে পরিষ্কার যে শিক্ষা আমরা পাই, তা হলো: এই মডেলের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
পৃথিবী আর পেছনে ফিরে যেতে পারে না।
আমরা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক এই ব্যবস্থা দ্বিগুণ জোর দিয়ে আঁকড়ে ধরতে পারি না, যার ফলে একই সঙ্গে জলবায়ু সংকট ও জ্বালানি সংকট ত্বরান্বিত হচ্ছে।
যা আমাদের জরুরি প্রয়োজন, তা হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের ইচ্ছাশক্তি।
উন্নতি–সমৃদ্ধির সঙ্গে টিকে থাকা ও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতার সামঞ্জস্য ।
প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এবং তা টেকসই করার উপায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য ।
সুযোগ ও ন্যায়বিচারের সামঞ্জস্য।
সুসংবাদ হলো, অতীতের প্রতিটি জ্বালানি সংকটের বিপরীতে এবার আমাদের সামনে রয়েছে একটি স্পষ্ট পথ।
একটি পরিচ্ছন্ন পথ।
বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নতুন বিদ্যুতের সবচেয়ে সস্তা, দ্রুততম এবং সবচেয়ে সম্প্রসারণযোগ্য উৎস।
২০১০ সাল থেকে সৌরবিদ্যুতের খরচ প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে; স্থলভাগের বায়ুবিদ্যুতের খরচ কমেছে ৭০ শতাংশের বেশি, আর ব্যাটারি বিদ্যুতের খরচ কমেছে ৯৫ শতাংশ।
গত বছর বিশ্বব্যাপী নতুন বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি ছাড়িয়ে গেছে বায়ুবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ।
ইতিহাসের যে কোনো বিদ্যুৎ উৎসের তুলনায় সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধির রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে।
বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন সংযোজনের ৯০ শতাংশেরও বেশি ইতিমধ্যে সবচেয়ে কম খরচের জীবাশ্ম জ্বালানি বিকল্পের চেয়ে সস্তা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুসারে, বিদ্যমান নবায়নযোগ্য জ্বালানি–সক্ষমতা শুধু ২০২৫ সালেই জীবাশ্ম জ্বালানির খরচ এড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ৪৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় করেছে।
আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সম্মিলিত বার্ষিক কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের চেয়েও বেশি নিঃসরণ এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
এখন জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত।
এই গতিবেগের একটা বড় অংশ এসেছে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো থেকে; তারা এখন অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত জ্বালানি বাজার থেকে নিজেদের মুক্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তারা একটা মৌলিক সত্য ধরতে পেরেছে:
তা হলো, একটা দেশ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বা জ্বালানি নিজের জন্য উৎপাদন করে তার প্রতিটি ইউনিয়টে এক ইউনিট করে ঘাটতি থেকে যায়, যা তাকে কিনতে হয় এমন এক জ্বালানি বাজার থেকে, যে বাজারের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; সেই জ্বালানি আসে এমন পথে, যে পথের নিরাপত্তা সে নিশ্চিত করতে পারে না; যে দামে তাকে সেই জ্বালানি কিনতে হয় তা নির্ধারিত হয় এমন সব ঘটনার দ্বারা, যার ওপর তার কোনো হাত থাকে না।
কিন্তু সূর্যের আলোর ওপরে তো কোনো অবরোধ–নিষেধাজ্ঞা–এমবার্গো নেই; অবরোধ নেই বাতাসে।
প্রিয় বন্ধুগণ,
আমাদের সিদ্ধান্ত এখন স্পষ্ট:
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে জ্বালানি–স্বনির্ভরতা গড়ে তোলা যায় না।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিই প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।
পরিবহন, ভবন ও শিল্পের বিদ্যুতায়ন করা হলো কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার দ্রুততম উপায়গুলোর অন্যতম।
যত বেশি অর্থনীতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে চলবে, তত বেশি নিরাপদ, স্থিতিস্থাপক এবং প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
তাহলে আমরা কীভাবে একটি পরিচ্ছন্ন রূপান্তর ঘটাব?
আমি সাতটি ধাপের কথা তুলে ধরতে চাই।
প্রথমত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রমের মাত্রা ও স্থায়িত্ব কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করার লক্ষে আমাদের আরও অনেক বেশি তৎপর হতে হবে।
বিজ্ঞানের কাছ থেকে আমরা একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ বা পথনকশা পেয়েছি:
কার্বন নিঃসরণ অবশ্যই অবিলম্বে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যাবে...তারপর এই দশক ধরে ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকবে... এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের নিট হার হবে শূন্য।
তবু পৃথিবী এখনও বিপজ্জনকভাবে ঠিক পথের বাইরেই রয়ে গেছে।
সর্বশেষ জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নিঃসরণের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে।
কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ১.৫ ডিগ্রি সীমার মধ্যে থাকতে হলে একই সময়ে নিঃসরণ ৬০ শতাংশ কমাতে হবে।
বৈশ্বিক নিঃসরণের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী যে জি ২০, তাদের অবশ্যই নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে হবে।
প্রত্যেক বড় নিঃসরণকারী দেশকে নিঃসরণ কমানোর পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করতে হবে।
এবং প্রতিটি দেশকে তাদের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি অর্জন করতে হবে।
২০২৩ সালের জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে সরকারগুলো যেমনটি অঙ্গীকার করেছিল, সেভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।
বন উজাড় করার তৎপরতা বন্ধ করে প্রকৃতি পুনরুদ্ধার করতে হবে।
কয়লা, তেল ও গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহার থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে।
কার্বন ডাই অক্সাইড দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের প্রধান চালক হিসেবে রয়ে গেছে।
এখন সময় এসেছে মিথেন কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।
মিথেন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী।
এই গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় প্রায় আশি গুণ বেশি শক্তিশালী।
কিন্তু কার্বন ডাই অক্সাইডের বিপরীতে মিথেন এক বা দুই দশকের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে ভেঙে যায়।
এর অর্থ হলো, ব্যাপক হারে মিথেন কমানো গেলে এক প্রজন্মের মধ্যেই দৃশ্যমান মাত্রায় তাপমাত্রা কমতে পারে।
এ কারণেই আজ আমি মিথেন নিয়ে একটি বৈশ্বিক কর্মসূচির আহ্বান জানাচ্ছি।
এই কর্মসূচিতে তিনটি খাতের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে:
বর্জ্য খাত: খাদ্য অপচয় কমানো, খোলা জায়গায় যখানে–সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা; ভাগাড় ও দূষিত জলাশয় থেকে নিঃসরণ সংগ্রহ করা, যাতে তা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে––এই ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া।
কৃষি খাত: প্রমাণিত সমাধানের মাধ্যমে নিঃসরণ কমানো, খাদ্য নিরাপত্তা বাড়ানো এবং কৃষকদের জীবিকা রক্ষা করা।
এবং সেই খাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ নিবদ্ধ করা, যে খাতটি আমাদের পৃথিবীর যুগল সংকটের মূল কারণ; যে খাতে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। সেটা হলো কয়লা, তেল ও গ্যাস খাত।
জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের জন্য যা বহু আগে থেকেই অবশ্যকরণীয়, তা করতে এগিয়ে আসার জন্য আমি এই শিল্পের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা দেখতে পেয়েছে, তেল ও গ্যাস থেকে মিথেন নিঃসরণের প্রায় ৭০ শতাংশ দূর করা সম্ভব বর্তমানে বিদ্যমান প্রযুক্তি ব্যবহার করেই; তার অনেকটাই কম খরচে বা কোনো নিট খরচ ছাড়াই।
তবু শুধু ২০২৫ সালেই প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস পোড়ানো হয়েছে, যে পরিমাণ গ্যাস আফ্রিকা ব্যবহার করে এক বছরে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির মিথেন অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স সিস্টেম (মিথেন সতর্কতা ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা) ইতিমধ্যে ৩৩টি দেশে পাঁচ হাজারের বেশি সতর্কতা জারি করেছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া হার মাত্র প্রায় ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই কারণেই স্বেচ্ছাসেবী পদক্ষেপ আর যথেষ্ট নয়।
বিশ্ব সিসাযুক্ত পেট্রলের ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ করেছে।
আমরা ওজোন ধ্বংসকারী রাসায়নিক দূর করেছি।
এবার মিথেন দূষণকে লক্ষ্যবস্তু করতে হবে।
আমি উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তেল ও গ্যাস খাতের জন্য একটি নতুন বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ করুন; সেটা হোক পুরো ভ্যালু চেইন জুড়ে প্রায়-শূন্য মিথেন নিঃসরণ।
দ্বিতীয়ত, যে জ্বালানি আমাদের সংকট ত্বরান্বিত করেছে, তার ওপর নির্ভরতা না বাড়িয়ে আমাদের আজকের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
পৃথিবী জুড়ে অনেক শক্তিশালী মহল এখনো আরও কয়লা খনি, আরও তেলক্ষেত্র, আরও গ্যাস সম্প্রসারণের দাবি করছে।
তারা এটা দাবি করছে এমন সময়ে, যখন পৃথিবী ইতিমধ্যে সহজলভ্য জীবাশ্ম জ্বালানির সবটা ব্যবহারে সক্ষম নয়; শুধু তাই নয়, তারা এমন সব নতুন নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানাচ্ছে যেগুলো তাদের অর্থনৈতিক আয়ু ফুরানোর আগেই সেকেল ও অচল হয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলা দরকার: এসব করা হলে শুধু যে সম্পদই আটকে পড়বে তা নয়, বরং পুরো অর্থনীতিই আটকে পড়বে।
আজকের ও আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন চলবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে।
ওলোটপালটের সময়ে পরিচিত জিনিস আঁকড়ে ধরা থাকার প্রবণতা কাজ করে, এটা আমি বুঝি।
‘যেভাবে চলছে সেভাবেই চলুক’— এই ধরনের কথায় কেউ কেউ ভরসা পায়।
কিন্তু এর মানে হলো কম নিরাপত্তার জন্য বেশি মাশুল গোনা।
এর মানে হলো একুশ শতকের শিল্প ও কর্মসংস্থান অন্যদের হাতে তুলে দেওয়া, আর নিজের ঘরে ঝুঁকি বাড়তে থাকা।
এটা নেতৃত্ব নয়। এটা পেছনে সরে যাওয়া।
এবং আমাদের একইভাবে বুঝতে হবে, কাকে বেশি মাশুল গুনতে হচ্ছে।
শ্রমজীবী মানুষকে।
তাদের পরিবারগুলো দিনকে দিন জীবনযাত্রা বৃদ্ধির চাপ অনুভব করছে, আরও বেশি অনিশ্চয়তাবোধে ভুগছে আর এমন অনুভূতি নিয়ে সংগ্রাম করে চলেছে যে বিদ্যমান ব্যবস্থা তাদের জন্য কাজ করছে না। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের দানবেরা অস্বাভাবিক হারে মুনাফা লুটে নিচ্ছ।
জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের বৃহত্তম আটটি কোম্পানি চলতি বছরের শুধু প্রথম প্রান্তিকেই অতিরিক্ত ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পকেটে ভরেছে; এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মাত্র এক মাসের হিসাবই ধরা হয়েছে, যখন তেলের দাম বাড়ছিল এবং মুনাফা বাড়ছিল।
এগুলো হলো অস্থিরতা, কষ্টকর পরিস্থিতি ও নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট দুঃখকষ্ট থেকে তুলে নেওয়া মুনাফা।
এসবের উপরে কর আরোপ করার জন্য আমি সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আহ্বান জানাচ্ছি সেই অর্থ সেই সব খাতে ব্যবহার করার জন্য, যে খাতের তা প্রাপ্য: নাজুক পরিবার ও জনগোষ্ঠীগুলোর সাহায্য–সহযোগিতা; নবায়নযোগ্য, পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী জ্বালানির দিকে অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করার কাজে।
কিন্তু ক্ষতিকর ভর্তুকি ও প্রণোদনা বন্ধু করাই যথেষ্ট নয়। আমাদের সেই সব কাঠামোগত বাধাও দূর করতে হবে, যেগুলো নবায়নযোগ্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রকল্পগুলোকে আটকে রাখছে।
গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রায়শই তাদের স্রেফ অপেক্ষা করছে, কখনো কখনো বছরের পর বছর ধরে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত।
বিতরণ ব্যবস্থা সেকেলে।
সংরক্ষণ ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ে আছে।
ডিজিটাল ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট স্মার্ট বা নমনীয় নয়।
আর আঞ্চলিক ও আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ এখনো খুব সীমিত।
যদি আমরা রূপান্তরকে গুরুত্বসহকারে নিই, তা হলে আমাদের গ্রিডকে কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিদ্যুতায়নের যুগে গ্রিড, সংরক্ষণ ও সিস্টেমের নমনীয়তার ব্যাপক সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
আর আমাদের প্রয়োজন একুশ শতকের উপযোগী বিধিবিধান।
আধুনিক পরিকল্পনা, দ্রুত অনুমোদন এবং পরিচালন ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে সরকারগুলোকে অবশ্যই বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
তৃতীয়ত, জ্বালানির চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় আমাদের এর দ্রুততম বৃদ্ধি পাওয়া উৎসগুলোর একটি মোকাবিলা করতে হবে; তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টারগুলো।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জলবায়ু সংকটের সমাধান ত্বরান্বিত করতে পারে।
এটি রোগ নিরাময়ে সাহায্য করতে পারে; শিক্ষা রূপান্তর করতে পারে, এবং মানবজাতিকে এমন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে পারে, এক সময় আমাদের নাগালের বাইরে বলে মনে হতো।
আমাদের সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।
কিন্তু কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা একই সঙ্গে ভূমি, পানি ও জ্বালানির জন্য ক্ষুধার্ত।
এর ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে ইতিমধ্যেই অধিকাংশ দেশের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ পাঁচটি দেশ বাদে সব দেশের চেয়ে বেশি হতে পারে; ব্যবহৃত পানির পরিমাণ এত বেশি হতে পারে, যা সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের ১.৩ বিলিয়ন মানুষের মৌলিক চাহিদা এক বছরের জন্য পূরণের জন্য যথেষ্ট।
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টারগুলো জমিও দখল করছে, এবং তা প্রাশই এমন জায়গায়, যেখানে এর সুফল খুব কমই পৌঁছে।
এই সব স্পষ্ট উদ্বেগ সত্ত্বেও মানুষকে তাদের চার পাশে গড়ে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে প্রায়শই অন্ধকারে রাখা হয়।
তাই আমি আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক পরিবেশগত স্বচ্ছতা উদ্যোগ (AI Environmental Transparency Initiative) গ্রহণের প্রস্তাব করছি।
আমি আজ কার্বন, পানি ও ভূমির ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাবের ছাপ পরিমাপ করে তা সমক্ষে প্রকাশ করার জন্য প্রতিটি বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে এমন অঙ্গীকার করার আহ্বান জানাচ্ছি যে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি ডেটা সেন্টার নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে চালানো হবে।
আর কোনো গোপন ব্যয় নয়।
সেই সব মানুষের কাঁধে আর কোনো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া নয়, যারা তা বহন করতে সবচেয়ে কম সক্ষম।
সত্য প্রকাশ করার সময় এসেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি আমাদের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে চায়, তা হলে এই শিল্পের জন্য এখনই আমাদের কী মূল্য দিতে হচ্ছে তা সম্পর্কে অবশ্যই সততা দেখাতে হবে।
চতুর্থত, আমাদের একটি ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে।
ইতিহাস থেকে আমরা এক কঠোর বাস্তবতার শিক্ষা পাই: সবচেয়ে বড় হুমকি খোদ রূপান্তর নয়, বরং তা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হওয়া।
আজ আমরা সেই ঝুঁকির মুখোমুখি।
জ্বালানি রূপান্তর সুসংগতভাবে এগোচ্ছে না।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়লেও জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে চলছে।
বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন দিকে টানছে।
উৎপাদকেরা জিজ্ঞাসা করছে: আমাদের আয়, আমাদের চাকরি, আমাদের অর্থনীতির কী হবে?
ভোক্তারা জিজ্ঞাসা করছে: জ্বালানি কি সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য থাকবে?
উন্নয়নশীল দেশগুলো জিজ্ঞাসা করছে: আমরা কি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারব, না পিছিয়ে পড়ে যাব?
শ্রমিক, নানা জনগোষ্ঠী ও তরুণ–তরুণীরা জিজ্ঞাসা করছে: এই রূপান্তর আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কী অর্থ বহন করছে?
এ মুহূর্তে এসব প্রশ্নের উত্তর সমন্বিতভাবে দেওয়া হচ্ছে না।
আমাদের একটি যৌথ, বাস্তবসম্মত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যেখানে মনোযোগ নিবদ্ধ থাকবে ফল উৎপাদনের দিকে।
প্রয়োজন একটি পরিসর বা ক্ষেত্র, যেখানে উৎপাদক, ভোক্তা, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ, অর্থনীতি, শিল্প, শ্রম ও নাগরিক সমাজ একত্রে মিলিত হবে।
প্রয়োজন এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে মনোযোগ দেওয়া হবে সেই বাস্তব সমস্যাগুলোর ওপর, যা নির্ধারণ করবে এই রূপান্তর সফল হবে না ব্যর্থ হবে।
আমরা কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমাব এবং একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি দ্রুত বাড়াব?
আমরা কীভাবে সেই দেশগুলোর অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামলাব, যারা জীবাশ্ম জ্বালানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল?
আমরা কীভাবে শ্রমিক ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের মাধ্যমে সহায়তা করব?
এবং আমরা কীভাবে বিনিয়োগকে প্রয়োজনীয় গতি ও পরিসরে সংগঠিত করব?
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন, কপ–৩১–এর আগে আমি নেতৃবৃন্দের প্রতি এই কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহবান জানাব।
কারণ, খোদ রূপান্তর এখন আর কোনো প্রশ্নের বিষয় নয়।
রূপান্তর হয় সুপরিচালিত হবে, নয় বিশৃঙ্খল হবে… হয় ন্যায়সঙ্গত হবে, নয় বৈষম্যমূলক হবে… হয় স্থিতিশীলতার উৎস হবে, নয়তো আরও বিভেদের উৎস হবে।
এই সিদ্ধান্তগুলো এখনো আমাদের হাতে।
আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কখনোই নোংরা প্রক্রিয়ার ওপর দাঁড়াতে পারে না।
ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর মানে হলো, যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠীর ভূমিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ রয়েছে, তাদের অবশ্যই এর সুফল পুরোপুরি ভাগ করে নিতে হবে।
উন্নয়ন ছাড়া আর কোনো উত্তোলন নয়।
পঞ্চমত, মানুষ ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু বিশৃঙ্খলার বর্তমান প্রভাব থেকে রক্ষা করতে আমাদের আরও অনেক বেশি কাজ করতে হবে ।
কারণ, পূর্ণ গতিতেও আমরা জলবায়ু পরিবর্তনকে ছাড়িয়ে যেতে পারব না।
এর প্রভাব ইতিমধ্যে আমাদের সামনে স্পষ্ট; ক্রমশ তা বাড়ছে এবং বিস্তৃত হচ্ছে।
একটি খরা দ্রুতই খাদ্যসংকটে পরিণত হতে পারে।
একটি ঝড় ঋণসংকটে রূপ নিতে পারে।
একটি তাপপ্রবাহ জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।
অভিযোজন অপরিহার্য।
অভিযোজন জীবন বাঁচায়, ঘরবাড়ি ও জনপদ সুরক্ষিত করে, অর্থনীতিকে ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করে এবং সমাজকে এক সঙ্গে ধরে রাখে।
তা সত্ত্বেও অভিযোজনকে দীর্ঘদিন ধরে দেখা হয় দাতব্য হিসেবে।
এটা ভুল।
জলবায়ুর প্রভাবের ফলে ইতিমধ্যে উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার রূপ–প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খাদ্য ও পানি ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করছে, সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং ভঙ্গুরতা বাড়াচ্ছে।
এই সব কিছু বিবেচনায় রেখে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।
উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্যন্ত অভিযোজনকে জাতীয় পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
আমাদের আরও কার্যকর বীমা ও ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রয়োজন এমন জরুরি ব্যবস্থা, যা যে কোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতির ধাক্কা মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত হওয়ার আগেই কাজ করবে।
আমাদের প্রয়োজন দুর্যোগ আসার আগে আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যবস্থা; ‘সবার জন্য আগাম সতর্কতা উদ্যোগ’ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা।
উন্নত দেশগুলোকে তাদের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে: অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ করতে হবে এবং তা তিন গুণ করার স্পষ্ট পথনকশা তৈরি করতে হবে।
এ থেকে চলে আসে ছয় নম্বর পয়েন্ট: এই সমস্ত কিছুর জন্য এমন অর্থায়ন প্রয়োজন, যা একই মাত্রা, গতি ও ন্যাযতার সঙ্গে আমাদের বর্তমানের যুগল সংকটও দাবি করছে।
যে দেশগুলোর সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, আজ বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা তাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে।
বৈশ্বিক আথিক ব্যবস্থা ঝুঁকির অতিমূল্যায়ন করছে আর সুযোগের অবমূল্যায়ন করছে।
অনেক উন্নয়নশীল দেশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও স্থিতিস্থাপকতার জন্য ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ধনী অর্থনীতির তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি খরচের মুখোমুখি হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিপ্লব থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।
বেশি দূরে তাকাতে হবে না; আফ্রিকা মহাদেশের দিকেই তাকান।
আফ্রিকা বিশ্বের সেরা সৌর সম্পদের ৬০ শতাংশের আবাসস্থল। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ৩০ শতাংশ আফ্রিকায়। আর আফ্রিকার মানুষ মানবজাতির এক-পঞ্চমাংশ।
তবু আফ্রিকা বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিনিয়োগের মাত্র ২ শতাংশ পাচ্ছে।
একই সঙ্গে ৬০০ মিলিয়নেরও বেশি আফ্রিকান এখনো বিদ্যুতের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
এটা অন্যায়; এটা আফ্রিকা ও পৃথিবীর জন্য বিশ্বের জন্য একটি সুযোগ হারানো।
উন্নত দেশগুলোকে ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণের তহবিল এবং গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতিসহ সব অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত ৩০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করতে হবে; ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার সংগঠিত করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাহায্য কমে যাওয়া বিশ্বে আমাদের বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক ও বৃহত্তর উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রভাবশালী ভূমিকা কাজে লাগাতে হবে, যাতে গ্রিড, গণপরিবহন ও পানি ব্যবস্থার মতো দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোর জন্য অর্থায়ন করা যায়।
সাম্প্রতিক সংস্কার ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ঋণদানের সক্ষমতা ৬০০-৮০০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
ভবিষ্যতের অবকাঠামো ও জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়নে তাদের অবশ্যই এই সক্ষমতা জোরালোভাবে কাজে লাগাতে হবে ।
প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ৫০ বছরের অর্থায়নসহ তাদের অবশ্যই চ্যালেঞ্জের ব্যাপকতা ও সময়সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আর্থিক উপকরণ ও নীতি–প্রক্রিয়াগুলোকে সাজিয়ে নিতে হবে।
আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে।
সাহসী পুনঃমূলধনীকরণ এবং আরও সংস্কারের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ঋণদানের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
আর্থিক পরিসর যখন ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, তখন প্রতিটি সরকারি ডলার আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে; আরও সৃজনশীলভাবে বেসরকারি মূলধন উন্মুক্ত করতে হবে।
এর অর্থ, গ্যারান্টি, স্থানীয় মুদ্রা অর্থায়ন, মিশ্র অর্থায়ন ও অন্যান্য ঝুঁকি ভাগাভাগির উপকরণ বাড়ানো, যেন মূলধনের ব্যয় কমানো যায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়—বিশেষত সেই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে ঝুঁকি বেশি বলে মনে করা হয়।
এর অর্থ হলো, উচ্চ নিঃসরণকারী খাতের ওপর সংহতি কর, জলবায়ু ঋণ-বিনিময়, কার্বন বাজারের আয় এবং দাতব্য তহবিল—এই সমস্ত অতিরিক্ত অর্থায়নের উৎস কাজে লাগানো।
এর আরও অর্থ হলো, সরকারি–বেসরকারি সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রমকে প্যারিস চুক্তি এবং উষ্ণায়নশীল বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে।
পরিশেষে বলব, পরীক্ষাটি সহজ:
জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে, আরও শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক প্রবৃদ্ধির পথ খুলে দিতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো এগিয়ে নিতে আমাদের অবশ্যই এমন গতিতে, পরিসরে এবং এমন সাশ্রয়ী মূল্যে মূলধন উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে সরিয়ে নিতে হবে, যেমনটা এই সময় দাবি করছে।
সাত নম্বর, এবং শেষ কথাটা হলো, আমাদের বিজ্ঞানকে রক্ষা করতে হবে, রক্ষা করতে হবে সত্যকেও।
বিপর্যয় আঘাত হানার আগেই তার ঝুঁকি উপলব্ধি করার সক্ষমতা বিজ্ঞান মানবজাতিকে দিয়েছে।
তবু জলবায়ু পদক্ষেপ বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতকে শক্তিশালী করতে এবং আস্থায় চির ধরানোর উদ্দেশ্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
আমাদের অবশ্যই বৈজ্ঞানিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে;
তথ্যপ্রমাণ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা বাড়াতে হবে;
জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে;
এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রত্যেকে নির্ভরযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের পায়।
জাতিসংঘ ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তথ্যের সততা রক্ষার জন্য বৈশ্বিক উদ্যোগ চালু করেছে।
তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যের সততা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রিয় বন্ধুগণ,
শুরু করেছিলাম চার্লস ডিকেন্সের কথা দিয়ে, শেষ করি তাঁর কথা দিয়েই ।
জলবায়ু এজেন্ডার জন্য এটা একই সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সময় এবং সবচেয়ে খারাপ সময়।
সবচেয়ে খারাপ সময় এই কারণে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্রতর হচ্ছে, শেষ সীমারেখা সামনে চলে আসছে, আর জ্বালানি সংকট জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার গভীর ঝুঁকি উন্মোচন করেছে।
আবার এটা একই সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সময় এই কারণে যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিপ্লব ইতিমধ্যে জোরেশোরে শুরু হয়ে গেছে।
এটা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব, বিদ্যুতায়নের বিপ্লব, খরচ কমার বিপ্লব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়ার বিপ্লব এবং বিরাট সুযোগের বিপ্লব।
এ এমন এক বিপ্লব, যা দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা থেকে মুক্ত করতে পারে, জ্বালানির প্রবেশাধিকার বাড়াতে পারে, নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, বাতাস পরিষ্কার করতে পারে, প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার করতে পারে, এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ আমাদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে।
বিরাট এক সুযোগ আমাদের সামনে, এবং একটা দায়িত্বও: ‘দুই সংকটের গল্প’কে একটি গল্প করে তোলার দায়িত্ব; গল্পটাকে দৃঢ়তা, ন্যায্যতা ও যৌথ অগ্রগতির গল্পে পরিণত করার দায়িত্ব।
আমরা অবশেষে জীবাশ্ম জ্বালানির অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে পারি, রচনা করতে পারি এমন একটি ভবিষ্যৎ, যা পরিচালিত হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিয়ে এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে।
এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত। আমাদের সত্যের মুহূর্ত। আমাদের সুযোগের মুহূর্ত।
আসুন, আমরা এই মুহূর্তটাকে কাজে লাগাই।
ধন্যবাদ।